হিং - বাঁধাকপিতে - বিউলিডালের - বড়ি (Biuli Daler Bori)
- Kaveri Nandi

- Dec 11, 2025
- 4 min read

'' মা '' !! আমার '' মা '' ! খুব ভালো মানুষ ছিলেন ! খুব গুণী ও ছিলেন | যদিও প্রত্যেক মা -ই এই পৃথিবীতে , তার সন্তানের কাছে , প্রকৃতই এক একজন মহান মানুষ , ভালো মানুষ আর অবশ্যই গুণী মানুষ! আমার মায়েরও অনেক গুন্ ছিল | হাতের তৈরি যে কোনো কাজই ভীষণ ভালো করতেন | তার মধ্যে একটি দারুন কাজ ছিল , নানা রকমভাবে বড়ি তৈরি করা | দারুন বড়ি দিতেন | দেখতে যেমন সুন্দর হতো ...খেতেও তেমনি | রান্নায় পড়লেই , রান্নার স্বাদ-গুন্ অন্য মাত্রায় পৌঁছে যেত | এক কথায় আমি তো বলবো , রান্না হয়ে উঠতো ''টেস্টে - বেস্ট '' !!

আমাদের এই বাংলায় '' বড়ি তৈরি '' এক বিশাল শিল্প ! বলতে গেলে এক দারুন হস্ত - শিল্প | বহু বহু বছর ধরে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে তৈরি হতো নানা ধরণের টেস্টি টেস্টি বড়ি , যেগুলো রান্নাঘরের নানা মেনুকে নানা ভাবে সমৃদ্ধ করে তুলতো | আসলে বড়ি , রান্নার ভীষণ ভীষণ এক প্রয়োজনীয় উপকরণ | আর বিশ্ব - বাংলার এক বিশাল ব্যবসা , এই বড়ির ব্যবসা | এই ব্যবসা কে কেন্দ্র করে কত কত সংসারের যে রুজি রুটি জোগাড় হচ্ছে , তা বোধহয় বলে বোঝানো যাবে না |

আমাদের মেদিনীপুর জেলা , আজ সারা বিশ্বের কাছে , তাদের গয়না - বড়ি , মশলা - বড়ি প্রভৃতি নানা ধরণের বড়ি তৈরির জন্য বিখ্যাত | দিকে দিকে পৌঁছে যায় এই তৈরি বড়িগুলো | নানান ধরণের বড়িগুলো দেখতে যেমন অসাধারণ ...খেতেও তেমনি অপূর্ব ! একবার পাতে পৌঁছে গেলেই , স্বাদ পেয়ে মন বলেই চলে , আবার চাই আবার চাই , আরো চাই আরো চাই |

হঠাৎ ক - দিন ধরে আমার মায়ের হাতের তৈরি বড়ির কথা খুব মনে পড়ছে , আর খেতেও খুবই ইচ্ছে করছে | ভাবলাম শীতের বেলা | সকালটা বেশ কড়া রোদে ঝলমল ঝলমল করে | এই সুন্দর কড়া রোদে যদি আমি সকাল সকাল বড়ি দিতে পারি ,তবে সেগুলো চটজলদি শুকিয়েও যাবে | ভাবতে ভাবতেই কাল রাতে খানিকটা কলাইয়ের ডাল জলে ভিজিয়ে রেখেছিলাম (Biuli Daler Bori)|
ভাবনা ছিল আজ সকাল সকাল উঠে , খানিকটা বাঁধাকপি কুচি আর হিং দিয়ে , বিউলির ডালের বড়ি দিয়ে ফেলবো | রোদ ভালো মতো উঠতে উঠতেই আমার বড়ি দেওয়া ও হয়ে যাবে | বাঁধাকপির বড়ি খেতে খুব খুব ভালো লাগে | খুব স্বাদের হয় | আর আমার সবজির ঝুড়িতে ছোট্ট মতন একটা বাঁধাকপি ও আমি কালই আনিয়ে রেখেছিলাম | আসলে মনে মনে কিছুদিন ধরে বড়ি দেওয়ার কথাই ভাবছিলাম যে !! বিউলি বা কলাইয়ের ডাল - এর বড়ি
উপকরণ :-
বিউলির ডালের বড়ি - ৩০০ - ৩৫০ গ্রামের মতো
বাঁধাকপি - মাঝের অংশ , অল্প , মিহি করে কুচনো , 3-৪ চা চামচ মতো
হিং গুঁড়ো - ২ চা চামচ
সর্ষের তেল - কয়েক ফোঁটা , বড়ি বসানোর থালায় একটু মাখিয়ে নেওয়ার জন্য , এতে বড়ি থালাতে আটকে থাকে না , শুকানো বড়ি সহজে থালা থেকে উঠে যায়
পদ্ধতি :-
যেটা ভেবে ছিলাম , সেই মতোই সব কিছু সকালে উঠে করেও ফেললাম | ভেজানো ডাল , কয়েকবার মিক্সিতে নিয়ে মিহি করে বেটে নিলাম | মাঝে মাঝে দু - একটা ডালের ভাঙা ভাঙা দানা দানা থাকলো | অল্প দানা দানা বাটা ডাল দিয়ে তৈরি বড়ি খেতে বেশ মজা লাগে | একটা পাত্রের মধ্যে ডাল বাটাটা নিয়ে খুব ভালো করে ফেটিয়ে নিতে লাগলাম | মাঝে মাঝে একটু করে জলের ছিটে দিয়ে , আবার ফেটিয়ে নিতে লাগলাম | এইভাবে ব্যাটারটা বড়ি দেওয়ার মতো করে ফেললাম |

এইবার একটা পাত্রে খানিকটা জল নিয়ে , তারমধ্যে অল্প একটু ফেটানো ডাল বাটা ছেড়ে দিলাম | টুকরোটা জলের উপর ভেসে উঠলো | বুঝতে পারলাম , বাটা ডাল ফেটানো হয়ে গেছে | এইবার ফেটিয়ে রাখা ডালের বাটির মধ্যে দিলাম ২ চা চামচ হিং আর ৩-৪ চামচ মিহি করে কুচানো বাঁধাকপি | বাঁধা কপির মাঝের অংশ টুকু মিহি করে কুচিয়ে নিয়েছিলাম | জলে ধুয়ে কুচানো বাঁধাকপি একটা কাপড়ের উপর রেখে , জল শুষিয়ে নিচ্ছিলাম | জল সমেত বাঁধাকপির টুকরোগুলো বাটা ডালের মধ্যে দেওয়া যাবে না | জল জল ভাবটা কুচানো বাঁধাকপি তে কম থাকলেই ভালো |
যাহোক এবার হিং আর কুচানো বাঁধাকপি সমেত ডাল কয়েকবার ফেটিয়ে নিয়ে , সমস্ত ভালো করে মিশিয়ে দিলাম | ডাল বাটা তৈরি | এবার বড়ি দেওয়া শুরু করতেই পারি | একটা পরিষ্কার থালা নিয়ে , থালার উপর দিয়ে দিলাম কয়েকফোঁটা সর্ষের তেল | থালার উপরে সমস্ত তেল ভালো করে মাখিয়ে নিলাম | এবার হিং - বাঁধাকপি সমেত বাটা ডাল থেকে বড়ির আকারে গড়ে গড়ে থালার উপর বসিয়ে দিতে লাগলাম | থালা ভর্তি বড়ি দেওয়া হয়ে যেতেই , চড়া রোদে বড়ির থালা রেখে দিলাম |

সকাল সকাল বড়ি দেওয়া সেরে নিয়ে ছিলাম | তাই বড়িও অনেকক্ষন চড়া রোদে থাকলো | আর সুন্দর রোদ পেয়ে বড়িগুলো ধীরে ধীরে থালা থেকে উঠেও এলো | ভালো রোদ পাওয়ার কারণে , এক রোদেই আমার বড়ি তৈরি | বড়ি উঠে গেলো ঠিক কথা , তবে বড়ি এখনো কাঁচা রয়েছে | ভালো করে কয়েকটাদিন রোদ খাওয়াতে হবে | তবেই তো বাঁধাকপি সমেত বড়ি মুচমুচে হয়ে যাবে |

এমনিতেই বাড়িতে , রান্নাঘরে কোটোত বড়ি থাকলে , সেগুলো ভালো রাখার জন্য , আমাদের মাঝে মধ্যে বড়ি, রোদে দিতেই হবে | তাহলেই বাড়িতে দেওয়া বড়িই হোক বা বাজারে কেনা বড়ি ....সব অনেক অনেকদিন খুব ই ভালো থাকবে | আর বড়ি তো আমাদের রান্নাঘরের এক বিশেষ বিশেষ উপকরণ | যেটা না হলে , অনেক রান্নাই অচল , আবার অনেক রান্নাই হয়ে ওঠে অসম্পূর্ণ |

যাহোক আমার বড়ি গুলো আজ সুন্দর হয়েছে | খুব খুব আনন্দ হচ্ছে | থালা থেকে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে বড়িগুলো আমি একটা ফাঁক ফাঁক ঝুড়িতে তুলে রাখলাম | রোজ , বড়ির ঝুড়ি রোদে দেবো , আর রোজ ঝুড়ি থেকে অল্প অল্প বড়ি নিয়ে নানা মুখরোচক মেনু তৈরি করবো | অনেক অনেকদিন বাদে বাড়ির তৈরি বড়ি খাবে বলে , বাড়ির সব্বাই বেজায় খুশি !! বাড়ির তৈরি বড়ি যে স্পেশাল স্বাদে ভরা থাকে , স্পেশাল ও হয় !! ( আর আমাকে যে আমার মায়ের কথাও মনে করিয়ে দেয় ) !!
ভালো থাকবেন | ভালো খাবেন | আনন্দে থাকবেন আর অনেক অনেক সুস্থ থাকবেন |
.jpg)



Comments